দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বাংলাদেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সাপের বিষের জন্য এখনো বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেই নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে পটুয়াখালীর একটি স্নেক ভেনম ফার্মকে ঘিরে। দীর্ঘ ২৬ বছরের অপেক্ষার পর সরকারি নিবন্ধন পেলেও ভেনম প্রক্রিয়াজাতকরণে কোনো ওষুধ কোম্পানি এগিয়ে না আসায় সম্ভাবনাময় এ উদ্যোগ এখনো বাস্তব রূপ পায়নি। অনুমোদন পেলে খামারটির বিষধর সাপ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের বিষ উৎপাদন সম্ভব, যা দেশীয় ঔষধ শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যা থেকে উৎপাদিত হতে পারে ক্যানসার, বি-ভাইরাসের মতো মরণব্যাধিসহ একাধিক দুরারোগ্য রোগের মহৌষধ অথবা অ্যান্টিভেনম। আর সরকারের অনুমোদন না থাকায় এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না। অনুমোদন পেলে সাপের বিষ আমদানি বাবদ সাশ্রয় হতে পারতো প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

প্রবাস জীবনের ইতি টেনে ২০০০ সালে পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে প্রবাসী আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস তাঁর গ্রামের বাড়িতে দেশের একমাত্র বাণিজ্যিক স্নেক ভেনম ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৮ সালে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ নামের সাপের খামারটি নিবন্ধন ও ২০১৮ সালে পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় নানা জটিলতা কাটিয়ে সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পাওয়ায় বৈধভাবে বিষধর সাপ থেকে ভেনম সংগ্রহের অনুমতি মিলেছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিষধর সাপ ধরে আনা কালো গোখড়ো, খইয়া গোখড়ো, কিং কোবরা, পক্সখীরাজ, কালকেউটে, দাঁড়াশ, বাসুয়া, কালকুলিন, সাদা গোমা, পদ্ম গোমা, বিষঝুড়ি, গোঁড়াস, পাইথনসহ প্রভৃতি প্রজাতির প্রায় ৩ শতাধিক সাপ খামারে রয়েছে।
প্রতিদিন অনেক দূর দুরন্ত থেকে অনেক দর্শনার্থী রাজ্জাক বিশ্বাসের এই সাপের খামারটি দেখতে আসেন। তারা বলেন রাজ্জাক বিশ্বাসের কথা শুনছি যে এখানে সাপ পালন করে। ব্যতিক্রমী একটি জিনিস, অনেকে কবুতর পালন করে, অনেক হাঁসের ফার্ম করে, অনেকে গরুর খামার করে, কিন্তু এই ব্যতিক্রমী একটা চাষ আমার কাছে খুব একটা ভয়ঙ্কর মনে হয়। আমি দেখার জন্য এখানে এসেছি, এখানে কিং কোবরা, অজগরসহ অনেক সাপ দেখছি। এখন যদি সরকার তাকে সহযোগিতা করে, তাহলে অনেক কিছু করতে পারবে সাপের খামার দিয়ে।

এলাকার অনেকে বলেন, সাপের ফার্মটি যদি চালু হয় তাহলে কাদের এলাকার অনেকের কর্মসংস্থান হবে, তারা বলেন বাহির থেকে সাপের যে বিষ এনে মেডিসিন তৈরি করে, এটা আমাদের বাংলাদেশে তৈরি হবে, সাপের ফার্মে কাজ করা অনেকে কর্মী বলেন, আমরা বিনা পরিশ্রমে কাজ করছি। আমরা একটা টাকা তার কাছ থেকে নেইনি। তার বাবা-মার চিকিৎসা করাতে পারেনি। বিনা চিকিৎসায় তারা মারা গেছে। তিনি সব টাকা এই সাপের খামারের পিছে খরচ করছেন। এই সাপের খামার চালাতে গিয়ে সে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই সাপের খামারটি পরিচালনা করতে যা কিছু দরকার সরকার যেন এটা বহন করে। তারা আরো বলেন দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাজ্জাক বিশ্বাস এই খামার পরিচালনা করছেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করলে এই উদ্যোগ দেশের জন্য বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে খামারটি টিকে থাকবে, পাশাপাশি কর্মীদের জীবন-জীবিকাও স্বাভাবিক হবে।
খামারের উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জানান, আমার এখন খামারটার যে পরিস্থিতি, মাঝখানে আমার খামারের একটা লোক মারা যায়, আমার ছেলে মারা গেছে এবং আমার বাবা-মা মারা গেছে। আছি আর্থিক সংকটে আছি। এই আর্থিক সংকটের কারণে সাপের খামারটি ঠিকমতো চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলবো তার মা এন্টিভেনাম তৈরি করার জন্য মহাখালীতে একটা উদ্যোগ নিয়েছিল। ইন্ডিয়া যখন সাপের বিষটি দেয়নি তখন ওই খামারটি বন্ধ হয়ে যায় এবং এন্টিভেনাম তৈরি করার প্রক্রিয়াটাও। আমি চাচ্ছি আমার এই বক্তব্যটি শোনার পরে জনাব তারেক জিয়া সাহেব উনি যদি আমার এই খামারটায় একটু সহযোগিতা করবেন। তার মায়ের স্বপ্ন ছিল যে অ্যান্টিভেনাম যদি এই দেশে তৈরি করা যায়, তাহলে বাংলার কৃষক গরিব মানুষ প্রতিবছর সাপের কামড়ে মারা যায় চিকিৎসার অভাবে, হয়তোবা সেটা কিছুটা হলেও লাগব হবে।

তিনি আরও বলেন, আমার বাবা যখন মৃত্যু সজ্জায় সে সময় আমি জমি বন্ধক রাখি, কিন্তু তারপরও আমি আমার মা বাবা ও সন্তানকে বাঁচাতে পারিনি। আজ আমি নিঃস্ব। পারতেছিনা খামারটি পরিচালনা করতে। এখন স্নেক ভেনাম লাইসেন্সটা সর্বপ্রথম পেলাম, লাইসেন্সটা পাওয়ার পর আমাদের অনেক কাজ, বিদেশে যেতে হবে, ট্রেনিং করতে হবে, কিভাবে কাঁচামাল সংগ্রহ করে তা ওষুধে রূপান্তর করতে হবে, অনেক অনেক কাজ। কিন্তু আর্থিক সংকটে পারতেছিনা। বাংলাদেশে এই প্রথম অনেক বছর পর একটা লাইসেন্সে শুরু করেছি।
আ. রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, জনাব তারেক রহমান সাহেব আমাকে যদি সাহায্য সহযোগিতা করেন তাহলে আমি পারবো বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করতে এবং মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে। তার মায়ের উদ্যোগটা যেন আমরা সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিতে পারি এটাই তার কাছে আমার অনুরোধ রইল।

উদ্যোক্তা বলেন, এই খামার গড়ে তুলতে ব্যক্তিগতভাবে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছি। বর্তমানে আর্থিক সংকটের কারণে কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে দেশে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
পটুয়াখালী প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না। নির্ধারিত মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং অনুমোদিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করতে হবে।’
উল্লেখ্য, রাজ্জাক বিশ্বাস ১৯৯৯ সালে এইচএসসি পাসের পর সৌদি আরবে প্রবাসী ছিলেন। সে সময় ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এক সাপের খামারের সন্ধান পান। ২০০০ সালে দেশে এসে সাপের স্নেক ভেনম নামের খামারটি প্রতিষ্ঠা করেন রাজ্জাক।
কেএম